বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ এবং ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ও আমাদের করণীয়


ডেঙ্গু জ্বর, যা ব্রেকবোন ফিভার নামেও পরিচিত, একটি সংক্রামক ট্রপিক্যাল ডিজিজ যা ডেঙ্গু ভাইরাস-এর কারণে হয়। বাংলাদেশ ডেঙ্গু (ডেঙ্গি) জ্বরে কাঁপছে। ডেঙ্গু মশা মূলত ট্রপিক্যাল বা সাব ট্রপিক্যাল এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে। এরা মূলত গরম দেশ পছন্দ করে। সেই হিসেবে আমাদের দেশে এই মশা বেশি হবে এটা খুব যৌক্তিক। যার কারণে হরহামেশাই আমরা এই মশার কামড় খাই হয়তো। ডেঙ্গু, প্রজাতি এডিস দ্বারা পরিবাহিত হয়। প্রধানত A. aegypti নামক মশকী (স্ত্রী মশা) এ রোগের জন্য দায়ী। এই মশা তখনই ক্ষতিকর হবে যখন এই মশা ডেঙ্গু জ্বরে সংক্রমিত কোনো ব্যক্তিকে কামড় দেবে। ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস তখন এই মশা বহন করবে এবং এই মশা যখন কোনো সুস্থ মানুষকে কামড় দেবে তখন ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন।

ভাইরাসটির চারটি প্রকার আছে। একটি প্রকারের সংক্রমণ সাধারণতঃ জীবনভর সেই প্রকারে প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়, কিন্তু অন্য প্রকারগুলিতে শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদী প্রতিরোধ ক্ষমতা দেয়। অন্য প্রকারের পরবর্তী সংক্রমণ প্রবল জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। যেহেতু কোন ভ্যাকসিন নেই তাই মশার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ ও মশার সংখ্যাবৃদ্ধি হ্রাস এবং মশার কামড়ের সম্ভাবনা কমানোর মাধ্যমে প্রতিরোধ প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। ডেঙ্গু মশা থেকে বাঁচতে যাঁর যাঁর বাড়ির সামনে–পেছনে সব জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে। ময়লা–আবর্জনা যত্রতত্র ফেলা যাবে না। মনে রাখতে হবে জীবন আপনার এবং আপনাকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে।

এবার আমরা দেখি এডিস এজিপ্টি দেখতে কেমন? বিশ্বখ্যাত জার্নাল নেচারের বর্ণনানুসারে এডিস এজিপ্টি ছোট ও কালো মশা। যাদের পায়ে সাদা ব্যান্ড ও শরীরের রুপালি সাদা রেখা আছে। ছবিতে দেখুন। ছবি থেকে এ মশা চিনে নিতে আরও সহজ হবে।



কিন্তু সবাই কেন এই মশার কামড়ে আক্রান্ত হয় না?

ডেঙ্গু ভাইরাসের চার ধরনের স্ট্রেইন আছে: ডেন (DEN) ১, ২, ৩ ও ৪। মূলত ডেন ১ ও ২–এর কারণে ডেঙ্গু জ্বর হয়। যাঁদের শরীর এই স্ট্রেইনের বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না, তাঁরা বেশি সংক্রমিত হন। ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণে দুই ধরনের সমস্যা হয়।
  • ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) ও
  • ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (ডিএসএস)
ডিএসএস হলো ডিএইচএফের পরের ধাপ এবং এই ডিএসএস রোগীর জন্য খুবই বিপজ্জনক। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর হলে শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। শরীরে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ছাড়াও আরও কিছু উপসর্গ দেখা যায়। যেমন, অত্যধিক অ্যাবডোমিনাল ব্যথা হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যায়। বমি বমি ভাব হয়। শরীরে অনেক সময় পানি জমে। প্লাটিলেট সংখ্যা কমতে থাকে।

কিন্তু ডেঙ্গু জ্বর যদি আরও জটিল অবস্থার দিকে যায় তখন ডেঙ্গু শক হয়। ডেঙ্গু শক হলে যে উপসর্গগুলো সাধারণ হয় তা হলো, চামড়া ভেদ করে রক্ত চলে এসে চামড়ার ওপর কালো দাগ পড়ে। কালো পায়খানা হয়। অনেক সময় প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত ঝরে। রক্তের প্লাজমা লিকেজ হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। লিভার ও হার্টের ক্রিয়া ক্ষমতা হ্রাস পায়।

এবার বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরে এই ডেঙ্গু শক বেশি হচ্ছে। মূলত শরীরের ফ্লুইড বের হয়ে যাওয়ার কারণে হঠাৎ শকে মানুষ মারা যাচ্ছে।

ডেঙ্গু মশার আরও একটি ভয়াবহ দিক হলো, যেহেতু চার ধরনের স্ট্রেইন এরা বহন করে এবং বারবার বিভিন্ন ধরনের স্ট্রেইন হুল ফুটানোর মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসতে পারে, তাই এ জ্বরের সঠিক চিকিৎসা অনেক সময় হয় না। আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো শরীরে একধরনের স্ট্রেইনের বিপরীতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে; কিন্তু দ্বিতীয়বার অন্য স্ট্রেইন দ্বারা আক্রান্ত হলে শরীর সেই স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়। ডেঙ্গু মশার এই নানা রূপের কারণে এবার মানুষের বেশি সমস্যা হচ্ছে।

জ্বর হলে তাই অবহেলা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত। তা ছাড়া যেহেতু এবারের জ্বরে ফ্লুইড ঝরে যাচ্ছে শরীর থেকে তাই জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ফ্লুইড জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত।

ডেঙ্গু জ্বরের ক্লিনিক্যাল কোর্স

ডেঙ্গু উপসর্গের বৈশিষ্ট্য হল হঠাৎ জ্বর হওয়া, মাথাব্যথা(সাধারণতঃ দু’চোখের মাঝে), মাসল ও জয়েন্টে ব্যথা, এবং র‍্যাশ বেরোনো। ডেঙ্গুর আরেক নাম “হাড়-ভাঙা জ্বর” যা এই মাসল ও জয়েন্টে ব্যথা থেকে এসেছে। মেরুদন্ড ও কোমরে ব্যাথা হওয়া এ রোগের বিশেষ লক্ষণ। সংক্রমণের কোর্স তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত:
  • প্রাথমিক
  • প্রবল এবং
  • আরোগ্য।
প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অত্যধিক জ্বর, প্রায়শ ৪০ °সে (১০৪ °ফা)-র বেশি, সঙ্গে থাকে সাধারণ ব্যথা ও মাথাব্যথা; এটি সাধারণতঃ দুই থেকে সাতদিন স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে ৫০-৮০% উপসর্গে র‍্যাশ বেরোয়। এটা উপসর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে লাল ফুস্কুড়ি হিসাবে দেখা দেয়, অথবা পরে অসুখের মধ্যে(দিন ৪-৭) হামের মত র‍্যাশ দেখা দেয়। কিছু petechia (ছোট লাল বিন্দু যেগুলি ত্বকে চাপ দিলে অদৃশ্য হয় না, যেগুলির আবির্ভাব হয় ত্বকে চাপ দিলে এবং এর কারণ হচ্ছে ভগ্ন রক্তবাহী নালী) এই জায়গায় আবির্ভূত হতে পারে, এবং কারুর মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প রক্তপাতও হতে পারে।

কিছু লোকের ক্ষেত্রে অসুখটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যার কারণে প্রবল জ্বর হয় এবং সাধারণতঃ এক থেকে দুই দিন স্থায়ী হয়। এই পর্যায়ে প্রচুর পরিমাণে তরল বুক এবং অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটিতে বর্ধিত ক্যাপিলারি শোষণ ও লিকেজের কারণে জমে। এর ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ হ্রাস পায়। এই পর্যায়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকলতা এবং প্রবল রক্তপাত হয়, সাধারণতঃ গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ট্র্যাক্ট হতে পারে। ডেঙ্গুর সব ঘটনার ৫%-এরও কম ক্ষেত্রে শক (ডেঙ্গু শক সিনড্রোম) এবং হেমারেজ (ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার)ঘটে, তবে যাদের আগেই ডেঙ্গু ভাইরাসের অন্যান্য স্টিরিওটাইপ-এর সংক্রমণ ঘটেছে(“সেকেন্ডারি ইনফেকশন”) তারা বর্ধিত বিপদের মধ্যে রয়েছেন।

এরপর আরোগ্য পর্যায়ে বেরিয়ে যাওয়া তরল রক্তপ্রবাহে ফেরত আসে। এটি সাধারণতঃ দুই থেকে তিনদিন স্থায়ী হয়। এই উন্নতি হয় চমকে দেবার মত, কিন্তু এতে প্রচন্ড চুলকানি এবং হৃদস্পন্দনের গতি ধীরহতে পারে। আরেকরকম র‍্যাশও বেরোতে পারে ম্যাকুলোপাপুলার বা ভাস্কুলাইটিক রূপে, যার ফলে ত্বকে গুটি বেরোয়। এই পর্যায়ে তরলের অতিপ্রবাহ অবস্থা ঘটতে পারে। যদি এতে মস্তিষ্ক আক্রান্ত হয় তাহলে সচেতনতার মাত্রা হ্রাস অথবা মুর্ছা যাওয়া হতে পারে। এর পর এক ক্লান্তির অনুভূতি অনেক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।


রাজধানীতে সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডেঙ্গু পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

  • NS1- ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিলো ১২০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা
  • IgM + IgE অথবা IgM/ IgE, ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিলো ৮০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা
  • CBC (RBC + WBC + Platelet + Hematocrit)- ৪০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিলো ১০০০ টাকা
ইতিমধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড সৃষ্টি করেছে
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৩৫ জন মারা গেছে
তবে সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ৮
ডেঙ্গুর ৪টি ভাইরাসের মধ্যে ডেনভি-৩ নতুন করে দেখা দিয়েছে
এখন শুধু ঢাকা শহর নয়, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকেও ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুম ইন-চার্জ ডা. আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, রাজধানীর বাইরে এর আগে কিছু-কিছু জেলা থেকে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হবার রিপোর্ট পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, "ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হবার সংখ্যা খুব কম। কিছু রোগী আছে যারা ঢাকা থেকে ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকার বাইরে গেছে।"

ঢাকার বাইরে যেসব জেলা থেকে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে - গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, বরিশাল, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, বগুড়া, ফরিদপুর, ফেনী।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক সাইফুল ফেরদৌস বলেন, সেখানে ৩৮ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছিল। এদের মধ্যে ১১ জন সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফেরত গেছেন। বাকি ২৭ জন এখনো সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানালেন মি: ফেরদৌস।

তবে আক্রান্ত রোগীদের সবাই ঢাকা থেকে এসেছে বলে তিনি জানান। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবার বাড়ি রাজশাহী জেলায়। তাদের কেউ রাজশাহীতে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হননি বলে জানান উপ-পরিচালক মি: ফেরদৌস।

সূত্র: প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া, ডেইলি স্টার

Load comments