নরমাল বার্থ - প্রসবের কোন ধাপে কি হয় - প্রসব এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সংক্রান্ত


প্রসবের কোন ধাপে কি হয়

প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটিকে তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথম ধাপে সারভিক্স (জরায়ুমুখ) প্রসারিত হয়। দ্বিতীয় ধাপে বাচ্চাটি ধীরে ধীরে নিচে নামে এবং যোনিপথে বেরিয়ে আসে। বাচ্চা বের হবার পর গর্ভফুল এবং এর আশপাশের শ্লেষ্মা ঝিল্লী যোনিপথে যখন বেরিয়ে আসে তাকেই তৃতীয় ধাপে ধরা হয়।

মানিয়ে নিন প্রসবের কষ্ট

রাতে ঘুমাতে চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে গরম পানিতে একটু স্নান করুন। সকালে স্বাভাবিক কাজকর্ম করার চেষ্টা করুন, তবে শরীরের ওপর বেশি ধকল নেবেন না। সোজা হয়ে চললে বাচ্চা মাধ্যাকর্ষণের টানে সহজেই নিচের দিকে নেমে আসে। হাল্কা কিছু খান, খালিপেটে থাকবেন না, প্রসবের প্রথম ১২-১৫ ঘন্টা আপনার অনেক শক্তি ক্ষয় হবে।

প্রথম ধাপ

জরায়ুমুখ প্রসারিত হওয়া

প্রসবের প্রথম ধাপে সঙ্কোচনের ফলে জরায়ুমুখ প্রসারিত হয় (সাধারনত ১০সে.মি. পর্যন্ত)।এর মধ্যে দিয়ে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে পারে এবং এসময় জরায়ু সম্পূর্ণ প্রসারিত ধরা হয়। কখনও কখনও প্রসারন হতে অনেক সময় লাগতে পারে। যখন জরায়ুমুখ অন্তত ৩ সে.মি. প্রসারিত হয় তখন নিশ্চিতভাবে প্রসব আরম্ভ হয়েছে বলা যায়। এই ধাপের আগে যদি আপনি হাসপাতালে যেয়ে থাকেন তবে আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হতে পারে আপনি আবার বাসা থেকে ঘুরে আসতে চান কিনা, কেননা অনেক্ষন নাহয় হাসপাতালেই কাটাতে হবে। এসময় আপনি হাল্কা কিছু খেতে পারবেন কিন্তু সাধারনত এসময় মায়েরা কিছু খেতে চান না।

প্রসব নিশ্চিত হওয়ার পর নার্স/ডাক্তার কিছু সময় পর পর আপনার যোনিপথে পরীক্ষা করে দেখবেন জরায়ুমুখ কতটুকু প্রসারিত হয়েছে। প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রসব নিশ্চিত হওয়া থেকে জরায়ুমুখ সম্পূর্ণ প্রসারিত হতে ৬ থেকে ১২ ঘন্টা লাগতে পারে। দ্বিতীয় এবং তৎপরবর্তী সময়ে এটা আরেকটু তাড়াতাড়ি হতে পারে। প্রসবের শেষ দিকে আপনার মনে হতে পারে সঙ্কোচনের সাথে সাথে পেটে চাপ দিলে বাচ্চা বের হয়ে আসবে। কিন্তু আসলে জরায়ুমুখ সম্পূর্ণ প্রসারিত না হওয়া পর্যন্ত চাপ প্রয়োগ করা চলবে না। এসময় ধীরে ধীরে ফু দিয়ে শ্বাস নিতে-ছাড়তে থাকুন। সঙ্কোচন বাড়তে থাকলে আপনি শান্ত থাকার যেসব পদ্ধতি এতদিন শিখে এসেছেন তা প্রয়োগ করতে পারেন।

আপনার স্বামী এসময় আপনার সাথে থেকে বা আপনাকে ম্যাসেজ করে আপনাকে শান্ত রাখতে সাহায্য করতে পারেন।

বাচ্চার হৃদস্পন্দন

প্রতিটি বাচ্চারই হৃদস্পন্দন প্রসবের সময় ভালভাবে খেয়াল রাখতে হয়। কেননা বাচ্চা যদি প্রসবের কোনও পর্যায়ে গিয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় চলে যায় তবে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। বাচ্চার হৃদস্পন্দন লক্ষ্য রাখার কিছু প্রচলিত উপায় –

ডাক্তার হাতে-নেয়া-যায় এমন একটি আল্ট্রাসাউন্ড মনিটর দিয়ে বাচ্চার হৃদস্পন্দন শুনতে পারেন (একে সনিকএইড ও বলে)।এই পদ্ধতিতে আপনার চলাফেরা বাধাগ্রস্ত হয় না। এছাড়াও সিটিজি নামক একটি যন্ত্রের সাহায্যেও বাচ্চার হৃদস্পন্দন এবং জরায়ুর সঙ্কোচন দেখা যায়। এটি আপনার পেটে বেল্টের সাহায্যে লাগানো হবে।

কখনও কখনও বাচ্চার মাথায় একটি ক্লিপ বসিয়ে আরও ভালভাবে এটা লক্ষ্য রাখা যায়। যোনিপথে পরীক্ষা করার সময় এই ক্লিপটি পড়ানো যায়। এই ক্লিপ পড়ানোর প্রয়োজনীয়তা জানতে ডাক্তারকে প্রশ্ন করুন।

প্রসবের পুরোটা সময়ই একটি যন্ত্র দিয়ে বাচ্চার হৃদস্পন্দন লক্ষ্য রাখা হবে। কিছু যন্ত্রে ছোট ট্রান্সমিটার থাকে যা লাগিয়ে আপনি সহজেই চলাফেরা করতে পারবেন। জানুন এরকম যন্ত্র আপনার হাসপাতালে আছে কি না।

প্রসব প্রক্রিয়া দ্রুত করা

যদি আপনার প্রসব ধীরে এগোয় তবে ডাক্তার একে দ্রুততর করতে পারেন। ডাক্তারের কাছ থেকে বুঝে নিন কেন এটি প্রয়োজন। প্রথমেই হয়ত যোনিপথ দিয়ে আপনার পানি ভাঙা হবে (যদি আগেই না ভেঙে থাকে)। এছাড়াও স্যালাইনের মধ্য দিয়ে হরমোন দেয়া হতে পারে।


দ্বিতীয় ধাপ

বাচ্চা প্রসব

এই ধাপ শুরু হয় যখন থেকে জরায়ুমুখ সম্পূর্ণ প্রসারিত হয় এবং এটি বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। এসময় আপনার ডাক্তার/ নার্স এর কথামত ঠিক সময়ে চাপ প্রয়োগ করুন।

অবস্থান

প্রসবে কোন অবস্থায় থাকলে আপনার ভাল লাগে সেই অবস্থানে থাকুন। আপনি বিছানায় শুয়ে বা আধশোয়া হয়ে থাকতে পারেন বা দাঁড়িয়ে, বসে, বা হাটুতে ভর দিয়ে থাকতে পারেন। যদি আপনি অনেক ক্লান্ত হোন তবে আপনি এককাত হয়ে শুলে ভাল বোধ করবেন। যদি গর্ভবতী অবস্থায় পিঠে ব্যাথা থেকে থাকে তবে চার হাতপায়ে ভর দিয়ে থাকলে ভাল বোধ করবেন। কয়েকভাবে চেষ্টা করে সবচেয়ে আরামদায়কটি বেছে নিন। নার্সকে ডাকুন আপনার সাহায্য করার জন্যে।

চাপ দেয়া

এবার প্রতি সঙ্কোচনের সাথে সাথে চাপ প্রয়োগ করতে থাকুন। বড় বড় শ্বাস নিয়ে চাপ দিন। সঙ্কোচন চলতে থাকলে কয়েকবার চাপ দিন। প্রতি সঙ্কোচনের পর বিশ্রাম নিন পরের সঙ্কোচনের সময় চাপ দেয়ার জন্য। এসময় প্রসবের সবচেয়ে কষ্টকর ধাপ, তবে আপনার ডাক্তার সবসময় আপনার পাশে থাকবেন এবং আপনাকে সাহায্য করবেন। এই ধাপে এক ঘন্টা বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

সন্তান জন্ম

বাচ্চা ধীরে ধীরে নিচে নামছে। এসময় নিচে হাত দিয়ে অথবা আয়নায় দেখতে পারেন বাচ্চার মাথা আপনার যোনি থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসছে। বাচ্চার মাথা যখন অর্ধেক দেখা যাবে তখন ডাক্তার আপনাকে চাপ দেয়া বন্ধ করতে বলবেন/ হাল্কা চাপ দিতে বলবেন/ ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে মুখ দিয়ে ফু করে ছাড়তে বলবেন। এভাবে আপনার যোনি এবং আশেপাশের মাংসপেশী শিথিল হয়ে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং ছেঁড়ার আশঙ্কামুক্ত থাকবে। প্রসারন ঠিকমতন না হলে যোনির আশেপাশে ছিঁড়ে যেতে পারে। ডাক্তার এসময় প্রয়োজনে আগেই আপনার সম্মতি নিয়ে দিতে পারেন। পড়ে অবশ্য তা সেলাই করে দেয়া হবে। বাচ্চার মাথা বের হবার পর সহজেই বাচ্চার শরীরের বাকি অংশ বের হয়ে আসে। ডাক্তার বাচ্চার নাড়ী কাটার আগে আপনার পেটের ওপর বাচ্চাকে রাখতে পারেন যেন বাচ্চার আর মায়ের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। বাচ্চার নাড়ি কেটে কাপড় দিয়ে বাচ্চার শরীর মোছা হয় যেন বাচ্চার ঠান্ডা না লাগে। বাচ্চার গায়ে রক্ত বা ভারনিক্স (জরায়ুর মধ্যে যে পিচ্ছিল পদার্থ বাচ্চাকে রক্ষা করে) লেগে থাকতে পারে। আপনি বাচ্চাকে কোলে নেবার আগে ডাক্তার বা নার্সকে বলতে পারেন যেন বাচ্চাকে একটা কাপড়/কাথার ভেতর পেচিয়ে আপনার কাছে দেয়। কখনও কখনও বাচ্চার নাক-মুখ থেকে মিউকাস মুছে বাচ্চাকে অক্সিজেন দেয়া লাগতে পারে। এরকম বাচ্চাকে মায়ের কাছে দেরি করে দেয়া হতে পারে।


তৃতীয় ধাপ

গর্ভফুল

বাচ্চা জন্ম হবার পর জরায়ুর সঙ্কোচনে গর্ভফুল (প্লাসেন্টা) বেরিয়ে আসবে। এই ধাপে ২০ মিনিট থেকে এক ঘন্টা সময় লাগতে পারে। তবে ডাক্তার বাচ্চা জন্মের পর আপনার উরুতে একটি ইঞ্জেকশন দিয়ে আরও কম সময়ে এই ধাপ শেষ করতে পারেন। এই ইঞ্জেকশনটিকে বলে সিন্টোমেট্রিন বা সিন্টোসিনোন। এর কারনে জরায়ু সঙ্কোচন হয় এবং রক্তপাত কমে আসে। আপনার প্রথমে এই ইঞ্জেকশন নাও লাগতে পারে তবে অপেক্ষা করে দেখুন প্রয়োজন হয় কিনা। ডাক্তারের সঙ্গে এব্যাপারে আগেই কথা বলুন।

প্রসব পরবর্তী পর্যায়

যদি প্রসবের সময় আপনার যোনিপথে বা কোনও ছেড়া হয় তবে তা সেলাই করা হবে। আপনি এপিডুরাল পেয়ে থাকলে এতে ব্যাথা লাগবেনা, না পেয়ে থাকলে আগে স্থানীয় চেতনানাশক দেয়া হবে। ছেঁড়া ছোট হলে অবশ্য সেলাই প্রয়োজন হবে না। আপনার বাচ্চাকে শিশু বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে দেখবেন এবং হাতে একটী কাগজে আপনার নাম লিখে লাগিয়ে দিবেন। নার্স এরপর আপনাকে হাত-মুখ ধুতে সাহায্য করবেন। এরপর আপনি আপনার স্বামী এবং বাচ্চা একসঙ্গে খানিক সময় কাটাবেন, পরিবারের নতুন সদস্যকে ভাল করে দেখবেন।


সূত্রঃ মায়া আপা (Copied Post) - সুস্থ ও সুন্দর নারী আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

Post a Comment

0 Comments