বাংলাদেশের বেশীরভাগ মহিলা, শহরের হন আর গ্রামেরই হন, তাদের বয়স ২০ বছর হওয়ার আগেই মা হয়ে যান। সরকার বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করায় এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। এখন আরও বেশি সংখ্যক মেয়ে তাদের বয়স ১৫-১৬ হলেই গর্ভধারণ করবে। সবধরনের আইন প্রনেতা ও মেয়েদের এর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

গর্ভধারণের বিষয়টি অনেক দেরিতে জানাঃ

বেশীরভাগ কিশোরীই যৌন বিষয়াবলী এবং তাদের শরীর সম্পর্কে ভাল ভাবে জানে না, তাই মাসিক না হলে, এবং গর্ভধারণের অন্যান্য লক্ষণগুলো দেখা দিলে তারা পরিবর্তনটা বুঝতে পারেনা। কেউ কেউ আন্দাজ করতে পারেলেও অন্য কাওকে বলতে ভয় পায়। এসময় তারা সকালে অসুস্থ বোধ করলে বা অন্য কোনভাবে অসুস্থ বোধ করলে ফার্মেসিতে গিয়ে ঘরে প্রেগনেন্সি টেস্ট করার জিনিস কেনার সাহসও পায় না।


যখন তারা জানতে পারে যে তারা গর্ভবতী তখন তার গর্ভধারনের ২ থেকে ৩ মাস পেরিয়ে যেতে পারে। এতে করে তাদের মেন্সট্রুয়াল রেগুলেশন করার (Menstrual regulation) বা গর্ভপাত (abortion) ঘটানোর বৈধ সময়সীমা পেরিয়ে যেতে পারে। গর্ভধারণের ৩ মাস সময় পার হয়ে গেলে তারা গাইনি বিশেষজ্ঞ বা মেরি স্টোপস ক্লিনিকের মত জায়গায় যাওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত ঘটানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে গর্ভপাত (abortion; এবরশন) ঘটানোঃ

কিশোরী মেয়েরা গর্ভবতী হয়েছে বুঝতে পারলে তারা বিবাহিত হোক আর অবিবাহিত হোক, এবরশন করার চেষ্টা করে। মা হবার জন্য প্রস্তুত না থাকার কারনে বা স্বামী অথবা প্রেমিকের চাপে তারা এটি করে। এসব মেয়েরা দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে মিসোপ্রোস্টল (Misoprostol)-এর মত এবরটিফিশিএন্ট (abortificients) অর্থাৎ গর্ভপাত ঘটানোর ওষুধ খেয়ে নেয়, যে ওষুধগুলো সাধারন নিয়মে গাইনি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে খাওয়ার কথা।

অনেক মেয়েকেই অত্যধিক পরিমাণে মিসোপ্রোস্টল ট্যাবলেট খাওয়ার কারনে অসম্পূর্ণ গর্ভপাত (ভ্রুনের অংশবিশেষ জরায়ুর ভেতর থেকে যাওয়া) ঘটার ফলে বা জরায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হওয়ার কারনে হাসপাতালে নিতে হয়।


দুটি অবস্থাই মারাত্মক হতে পারে। অপর দিকে সস্তা, অনিরাপদ ও নোংরা ক্লিনিকে নার্স বা আয়াদেরকে দিয়ে এবরশন করার চেষ্টা করলে মারাত্মক রকমের ক্ষতি বা সংক্রমণ হতে পারে। এর ফলে বিভিন্নরকম সংক্রমণ, প্রচুর রক্তপাত, চিরকালের জন্য মা হতে পারার সম্ভাবনা নষ্ট হওয়া, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

প্রসব পূর্ব যত্নের অভাবঃ

কিশোরী মায়েরা সুযোগ বা সচেতনতার অভাবে অথবা ভয়ের কারনে গাইনি ডাক্তারের পরামর্শ নেন না। এর ফলে তাদের প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। প্রসব পূর্ব সেবা গ্রহণকালে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থাগুলো বাছাই করা হয়। যাদের ত্রুটিযুক্ত বাচ্চা জন্মদানের সম্ভাবনা আছে বা যারা সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার আগে সন্তান প্রসবের ঝুকিতে আছে, আগে থেকে পরীক্ষা করে জানা থাকলে, এমন মায়েদেরকে বিশেষ সেবা প্রদান করা সম্ভব হয়।


প্রসব পূর্ব সেবার সুবিধা প্রাপ্ত নন এমন কিশোরী মায়েদের মধ্যে মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হার বেশি হয়, কারন তারা যথার্থ পরীক্ষা-নিরিক্ষার ভেতর দিয়ে যান না এবং যত্ন লাভ করেন না। নিয়মিত আয়রন বা লৌহযুক্ত সাপ্লিমেন্ট না খাওয়ার কারনে এদের এনিমিয়া (রক্তের লোহিত কনিকা কমে যাওয়া) হতে পারে । প্রসবের সময় প্রচুর রক্তপাত ঘটলে এই অবস্থা আরও মারাত্মক হতে পারে। প্রসব পূর্ব সেবা গ্রহনের সময় ফলিক এসিড ট্যাবলেট দেয়া হয় যা শিশুর নিউরাল টিউবের সমস্যা (neural tube defects) প্রতিরোধ করে। মা এই ট্যাবলেট না গ্রহণ করলে বাচ্চার মস্তিস্ক বা স্নায়ুরজ্জু (spinal cords) ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে।

তাড়াতাড়ি বিয়ে হওয়া মানে তার মতামতের গুরুত্ব কম থাকা

কিশোরী বয়সে বিয়ে হয়ে গেলে প্রায়ই মেয়েদের কথায় কেউ গুরুত্ব দেয় না। একটি ১৫ বছরের মেয়ের চাইতে একটি ২০ বছর বয়সী মেয়ে অনেক জোর দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে। বিয়ের পরপরই মেয়েদের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে তার সন্তান জন্মদান ক্ষমতার প্রমান দেয়ার জন্য চাপ দেয়া শুরু করে। বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে কোন মেয়ে সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হলে তাকে বন্ধ্যা মনে করে অনেক সময়ই তার স্বামী তাকে ছেড়ে দেন বা তার সাথে শ্বশুরবাড়ির সবাই খারাপ ব্যবহার করে। সন্তান জন্ম না দিয়ে তাদের কোন উপায় থাকেনা এবং প্রায় কোন সময়ই কয়টি সন্তান নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে তাদের মতামত কোন গুরুত্ব পায় না।

উচ্চ রক্তচাপ/ প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়া (Pre eclampsia) / গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Pregnancy Diabetes):

২০ বা ৩০ বছর বয়সের পরে যারা গর্ভধারণ করেন তাদের চাইতে কিশোরী মায়েদের গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে ভোগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। গর্ভকালীন সময়ে উচ্চ রক্তচাপ থেকে প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়া হয়ে যেতে পারে যা একটি মারাত্মক অসুখ। এটি হলে প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বেরিয়ে আসে, মায়ের মুখ ও শরীর ফুলে যায়, খিঁচুনি দেখা দেয়, এমনকি তার কোন অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রি-এক্ল্যাম্পশিয়া আছে এমন মায়েদের প্রসব নির্ধারিত সময়ের আগেই হবে এবং মা ও শিশুকে অবশ্যই ‘নবজাতকের জন্য নিবীড় পরিচর্যা কেন্দ্রে’ (NICU) রেখে পরিচর্যা করতে হবে।


অপরদিকে, গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করা বা চিনির পরিমাণ বেড়ে গেলে শিশুর ওজন অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারে। এসব শিশুর রক্তে চিনির পরিমাণ জন্মের পর পর কমে যায় এবং তাদেরকে শিরা পথে গ্লুকোজ দিতে হতে পারে এবং তার হাইপোগ্লাইসেমিয়া (hypoglycemia) বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা (respiratory distress) দেখা দিলে ‘নবজাতকের জন্য নিবীড় পরিচর্যা কেন্দ্রে’ (NICU) রেখে পরিচর্যার দরকার হতে পারে।


নির্ধারিত সময়ের আগে বাচ্চা প্রসব হওয়াঃ


গর্ভের ৪০ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে বাচ্চা প্রসব হলে নির্ধারিত সময়ের আগে বাচ্চা প্রসব হয়েছে বলে ধরা হয়। এরকম বাচ্চার শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, বিভিন্ন সংক্রমণ বা জন্ডিসে ভোগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এসময় মায়েদেরও বুকের দুধ তৈরি হতে সমস্যা হয়। এসব শিশুকে ইনকিউবেটরে রাখতে হয়, যা বাবা-মায়েদের জন্য অনেক কষ্টকর এবং ব্যয়সাপেক্ষ।


কম ওজন নিয়ে জন্মানো শিশুঃ


নির্ধারিত সময়ের চাইতে কম সময় গর্ভে থাকার কারনে অর্থাৎ ৪০ সপ্তাহের আগে জন্মানো শিশুর ওজন কম হয়। কম বয়সী মায়েরা অপুষ্টিতে ভুগেন বলেও বাচ্চার ওজন কম হয় এবং এসব বাচ্চা জন্মের পর অনেক ধরনের জটিলতায় ভোগার সম্ভাবনা থাকে।

বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগঃ


শরীর বিষয়ে অজ্ঞতা এবং কনডম ব্যবহার না করার কারনে যেসব কিশোরী মা হয় তাদের বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগে ভোগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এসব মায়েদের শরীর থেকে তাদের সন্তানের দেহে এইডস, হেপাটাইটিস বি, এবং ক্ল্যামিডিয়া (Chlamydia)-এর মত অসুখ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।


প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা (Post Partum Depression)


গবেষণায় দেখা গেছে যে কিশোরী মায়েদের প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা ভোগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ, কারন এ থেকে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতায় ভোগার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতায় ভোগা মায়েরা তাদের সন্তানদের সঠিক যত্ন নেয় না এবং অনেক সময় আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পূর্ণবয়স্ক মায়েদের এই সমস্যার সম্ভাবনা কম থাকে কারন তারা নিজেরাই গর্ভধারণের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে থাকে।

সূত্রঃ মায়াআপা

Post a Comment

Previous Post Next Post