ক্যালসিয়াম খাচ্ছেন তো (খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনুন)


ক্যালসিয়াম খাচ্ছেন তো!

শরীরের জন্য ক্যালসিয়াম কতটা প্রয়োজনীয় তা জানা স্বত্বেও আমরা মহিলারা প্রতিদিনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় ক্যালসিয়াম গ্রহণ করি না। ক্যালসিয়াম শুধু দাঁত ও হাড়ের মজবুত গঠনের জন্য দরকারি নয়, এটি অস্টিওপোরসিস (osteoporosis, এ অসুখটি হলে হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়) প্রতিরোধ করে, হৃদরোগ ও কলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে এবং মাসিকের সময়ের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। মহিলাদের জন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা জরুরি।

সারা পৃথিবীতে ২০ কোটি নারী অস্টিওপোরসিসে আক্রান্ত যাদের মধ্যে রয়েছে ৬০ বছর বয়সী নারীদের ১০%, ৭০ বছর বয়সী নারীদের ২০%, ৮০ বছর বয়সী নারীদের ৪০% এবং ৯০ বছর বয়সী নারীদের ৬৬%। এর সাথে এটাও মনে রাখা জরুরী যে দুধ ক্যালসিয়ামের সবচেয়ে ভাল উৎস হলেও দক্ষিন এশিয়ার প্রতি চার জনের একজন দুধ হজম করতে পারেন না (lactose intolerant)।

আবার বাংলাদেশের অনেক মহিলা দুধ খেতেও পান না। কারণ এখানে নারীদের কম খাওয়ার একটা সংস্কৃতি চলে আসছে। এই বাস্তবতাগুলো মনে রেখেও মহিলাদেরকে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের উপায় বের করতে হবে।

ক্যালসিয়ামের চাহিদা পুরনের জন্য আমরা কী করতে পারি?

কিশোর বয়সে শরীরের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। এসময় আপনার হাড় মজবুত করে তোলা জরুরী, যাতে পরে আপনার অস্টিওপোরসিসের মত অসুখ না হয়। ৯-১৮ বছর বয়সী মেয়েদের দিনে ১৩০০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম প্রয়োজন হয়। খাবারের মাধ্যমে যথেষ্ট ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে এবং ব্যায়াম করে আপনি বাকি জীবনের জন্য মজবুত হাড় নিশ্চিত করতে পারেন। দড়ি লাফ, দৌড়ানো এবং হাঁটার মত ব্যায়ামগুলো করুন। কোমল পানীয় বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পরিহার করুন। প্রথমত, দুধের বদলে কোমল পানীয় খেলে আপনি ক্যালসিয়াম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, কোমল পানীয়তে ফসফোরিক অ্যাসিড থাকে যা হাড় থেকে ক্যালসিয়াম সরিয়ে দেয়।

ক্যাফেইন গ্রহণ করলে তা ক্যালসিয়াম হজম করে ফেলা বাড়িয়ে দেয় এবং শরীর এটা শোষণ করতে পারে না। দিনে তিন কাপের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে তা কম দুধ বা কম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করছেন এমন মহিলাদের হাড় দুর্বল করে দেয়।

গর্ভবতী এবং বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েদের জন্য ক্যালসিয়াম গর্ভের শিশুর হাড় তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম মায়ের শরীরের রক্ত থেকে নেয়া হয়।

একারনে গর্ভাবস্থায় পরিপাকতন্ত্রের ক্যালসিয়াম শোষণক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এসময় যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়ামের সরবরাহ না থাকলে তা মায়ের দেহের হাড় থেকে নেয়া হয়। এস্ট্রোজেন হরমোন যা গর্ভাবস্থায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে, তা খুব বেশি ক্ষয়ে যাওয়া থেকে হাড়কে রক্ষা করে। ক্যালসিয়াম প্রি-এক্লাম্পসিয়া (pre-eclampsia) প্রতিরোধ করে। প্রি- এক্লাম্পসিয়া হলে আপনার রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার কারনে প্রস্রাবের সাথে মিশে প্রোটিন বের হয়ে আসে এবং তা থেকে অন্যান্য জটিলতা তৈরি হয়।


আপনি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাইয়ে থাকলে সেই দুধের ক্যালসিয়ামের বেশিরভাগটাই আসে আপনার হাড় থেকে এবং বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেয়ার ছয় থেকে বার মাসের মধ্যে সেই ক্ষতি পুরন হয়ে যায়। গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাস এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মায়েদের শরীরে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। গর্ভবতী এবং বুকের দুধ দিচ্ছেন এমন মায়েদের দিনে ১২০০-১৫০০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়ামের দরকার হয়। আপনার খাওয়া-দাওয়া ঠিকভাবে না হলে এসময় ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হবে।

ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর


৩৫ বছর বয়স থেকে হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়া শুরু হয় এবং ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে গেলে এই প্রক্রিয়া  দ্রুততর হয়। এস্ট্রোজেন হাড়কে সুরক্ষা দেয় এবং ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এস্ট্রোজেনের পরিমাণ কমে গেলে অস্টিওপোরসিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ঋতুচক্র বন্ধ হয়ে গেছে এমন মহিলারা হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপির মধ্যে থাকলে তাদের প্রতিদিন ১০০০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হয় এবং এই থেরাপির মধ্যে না থাকলে প্রতিদিন ১৫০০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হয়।

ভিটামিন ডি


ভিটামিন ডি ছাড়া ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে কোন উপকার পাওয়া যায় না, কারন এটি পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে। আমাদের শরীরের ত্বক সরাসরি সূর্যের আলোর সংস্পর্শে এলে ক্যালসিয়াম তৈরি করে। যারা সম্পূর্ণ বোরকায় ঢাকা হয়ে চলাফেরা করেন তারা স্বাভাবিকভাবে ভিটামিন ডি তৈরির মত সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসতে পারেন না। এথেকে পিঠের নিচের দিকে, হাঁটুতে এবং শরীরে ব্যাথা হয়। আপনি সম্পূর্ণ বোরকায় ঢাকা হয়ে চলাফেরা করলে দিনে ১০-১৫ মিনিট সূর্যের আলোয় বসে থাকার জন্য একটা সময় বের করুন যাতে আপনার হাতে ও পায়ে রোদ লাগে। এজন্য দিনের সবচেয়ে ভাল সময়টা হচ্ছে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা। এখানে যেসব খাবারে ভিটামিন ডি থাকে তার একটা তালিকা দেয়া হলঃ

উৎস ক্যালসিয়ামের পরিমাণ


  • এক কাপ দুধ ৩০০ মি.গ্রা.
  • আধ কাপ পনির ১৪০ মি.গ্রা.
  • ৩/৪ কাপ বা ১৫০ গ্রাম কাপ দই ২৫০ মি.গ্রা.
  • ১ কাপ রান্না করা ব্রকলি ৬০ মি.গ্রা.
  • ১ কাপ সেদ্ধ পালং শাক ২৪৫ মি.গ্রা.
  • ১ কাপ ঢেঁড়স ১২৫ মি.গ্রা.
  • ১ কাপ সেদ্ধ মটরশুঁটি ১০০ মি.গ্রা.
  • ১ কাপ আলমন্ড ৩৫০ মি.গ্রা.
  • চান্দা মাছ (১০০ গ্রাম) ৩৪৮ গ্রাম
  • মলা মাছ (১০০ গ্রাম) ৭৭৬ গ্রাম
  • পুঁটি মাছ (১০০ গ্রাম) ৭৮৪ গ্রাম
  • ১ টা কমলা ৬০ মি.গ্রা.
  • ১ টা খেজুর ৩০ মি.গ্রা.
  • ১০০ মি.গ্রা. চানা ডাল ২০০ মি.গ্রা.
  • ১০০ মি.গ্রা. মুগ ডাল ১২৫ মি.গ্রা.

সূত্রঃ মায়াআপা 

Post a Comment

0 Comments