নারী যৌনাঙ্গের সঠিক যত্ন – না বলা সমস্যাসমূহ

নারী যৌনাঙ্গের সঠিক  যত্ন – না বলা সমস্যাসমূহ

নারীর বহিঃযৌনাঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে ব্যাকটেরিয়া ও ঈস্টের(ছত্রাক) মতো অসংখ্য অণুজীব উপস্থিত থাকে। শরীরের ত্বকের মতো, এইসব অণুজীব ও ব্যাকটেরিয়ার একটি নির্দিষ্ট সমন্বয় যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনুজীবগুলি, জননাংগে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিহত করে এবং জননাংগের পিএইচ (অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের স্থিতাবস্থা) নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই অণুজীবগুলোর মধ্যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়, তখন তা ঈস্ট সংক্রমণ, ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস (যোনিপথে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ) প্রভৃতি রোগের সৃষ্টি করে থাকে। সেই সাথে, নারীরা তাদের সঙ্গীদের মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরণের সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারেন। এইসব কারণে নারীর জননাঙ্গের নিবিড় যত্ন নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাথরুম করার এবং স্যানিটারি প্যাড পরিবর্তনের আগে ও পরে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন। ভালো মানের ব্যাকটেরিয়া নাশক হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে অন্তত ১ মিনিট হাত ভালো করে ধুয়ে নিন।

যোনিপথ সাবান দিয়ে পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকুন। সুবাসিত ও সুগন্ধী পন্য ব্যবহার করে মহিলারা প্রায়ই অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার শিকার হোন যা ছত্রাক সংক্রমণের সৃষ্টি করে। জননাংগ পরিষ্কার করতে নিয়ন্ত্রিত অম্ল ও ক্ষারযুক্ত (PH balanced) ক্লীনজার ব্যবহার করুন। যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে খুব মৃদু সাবান ব্যবহার করুন। দিনে একবারের অধিক সাবান দিয়ে ধোয়া উচিৎ নয়। বেশী বেশী সাবান দিয়ে ধোয়া বা অপরিমিত অম্ল বা ক্ষারযুক্ত সাবান ব্যবহার অণুজীবের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে এবং তাতে সংক্রমণের সৃষ্টি হয়।

পানি দিয়ে ধোয়ার পর টিস্যু দিয়ে শুকিয়ে নিন। ধর্ম, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সকল নারীদের এটা অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ যে বাথরুমে গিয়ে শুধুমাত্র জননাঙ্গ মোছা মানেই পরিষ্কার করা নয় বরং প্রথমে পানি দিয়ে ধোয়া এবং পরে টিস্যু দিয়ে শুকিয়ে নেয়াটা সঠিক।

জননাগের লোম সম্পূর্ণরূপে না চেঁছে, ছাঁটাই করে নেয়া উত্তম।

প্রেসক্রিপশন ছাড়া কখনোই দীর্ঘ সময়ের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ গ্রহণ করবেন না। কারণ এতে সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে অ্যান্টিবায়োটিক ধ্বংস করে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমণের পথ সুগম করে দেয়।

বাথটাব এর পরিবর্তে ঝর্না ব্যাবহার করে গোসল করা ভাল। বাথটাবে পানি, বিশেষ করে গরম পানি জননাংগের চারপাশে দীর্ঘ সময়ের জন্য জমে থাকে এবং তা ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়ার সংখ্যাবৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

সুতির অন্তর্বাস ব্যবহার করুন এবং তলদেশে আঁটসাঁট কাপড় পরা থেকে বিরত থেকে ঢিলেঢালা কাপড় পড়ুন। কৃত্রিম উপাদানে তৈরি আঁটসাঁট কাপড় এবং জিন্স বাতাস রোধ করে রাখে। শরীরের নিচের দিকের পোষাকের মধ্যে বাতাস প্রবাহিত হওয়া অত্যন্ত জরুরী কেননা তা ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে।

রজঃস্রাব চলমান অবস্থায় না থাকলে প্যাড পরে রাখবেন না। কৃত্রিম উপাদান দীর্ঘ সময় শরীরের সাথে যুক্ত রাখলে তা বারবার সংক্রমণ ও জ্বালার সৃষ্টি করবে। যদি আপনার ত্বক খুবই সংবেদনশীল হয়ে থাকে, তাহলে পুরোনো বিছানার চাদর কিংবা কোনো সুতির কাপড় কেটে তা দিয়ে প্যাডের উপরের অংশ আবৃত করে ব্যবহার করুন। এতে করে ত্বক প্যাডের সংস্পর্শে আসবে না এবং অ্যালার্জি সৃষ্টি করবে না।

ভালো বা সাহায্যকারী ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার জন্য প্রোবায়োটিক (উপকারী) খাবার যেমন – দই খাওয়া উপকারী।

প্রতিদিন জননাংগ ধোয়ার জন্যে সাবানের উত্তম বিকল্প হলো ৩% ভিনেগার ও পানির দ্রবণ অথবা ২ লিটার পানির সাথে অর্ধেক লেবুর রস মিশ্রিত তরল। সাবান ব্যবহার যোনির স্বাভাবিক অ্যাসিড ময় পিএইচকে অ্যালকালিনে রূপান্তরিত করে দিতে পারে যা ক্ষতিকর জীবানু বৃদ্ধির সহায়ক।

যোনিপথে সংক্রমণঃ যোনিপথ শুকিয়ে যাওয়া, বিবর্ণ হওয়া বা ফেটে যাওয়া পরিলক্ষিত হলে অথবা যৌন মিলনের সময় ব্যথা হলে সংক্রমণ সন্দেহ করা যেতে পারে। প্রস্রাবের সময় অথবা তলপেটে ব্যথা হতে পারে। যোনির ভেতরের আবরন ও অভ্যন্তর স্বাভাবিক অবস্থায় স্যাঁতস্যাঁতে, গোলাপি রংযুক্ত এবং এক ধরনের ঘন তরলের হালকা আবরনে ছাওয়া থাকে। এরকম না থাকলে শুকিয়ে গিয়ে সংক্রমণের সৃষ্টি করতে পারে যা পরবর্তীতে ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়া্তে পারে।


ঈস্ট বা ছত্রাক সংক্রমণ


দীর্ঘ দিন এন্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ সেবন করলে অথবা গর্ভাবস্থা, জননাঙ্গে ছত্রাক সংক্রমণের কারন হতে পারে। আবার কিছু কিছু মহিলা প্রাকৃতিকভাবেই ছত্রাক সংক্রমণপ্রবন হয়ে থাকেন। সবচেয়ে সচরাচর ছত্রাকটি ক্যানডিডা অ্যালবিকানস নামে পরিচিত যা প্রাকৃতিকভাবে যোনিতে থাকে কিন্তু কখনো কখনো সংখ্যাবৃদ্ধি করে সংক্রমণের সৃষ্টি করে। ডায়াবেটিস ও এইডস এধরণের সংক্রমণের কারন হতে পারে। লালভাব, জ্বালা, চুলকানি, সাদাটে স্রাব এবং প্রস্রাবের সময় জ্বালা হওয়া প্রভৃতি হলো ছত্রাক সংক্রমণের লক্ষণ। স্রাব দেখতে সাদাটে অথবা পনিরের রঙের হয়ে থাকে। এ সংক্রমণের চিকিৎসা হলো ক্লোট্রিমাজোল বা মাইকোনাজোল মিশ্রিত মলম যা সব ঔষধের দোকানে পাওয়া যায়। ১% ক্লোট্রিমাজোলের সাথে ১% হাইড্রোকট্রিসোন মিশ্রিত মলমও ঈস্ট সংক্রমণের উত্তম চিকিৎসা করে। ভ্যাজাইনাল সাপোজিটরি হিসেবে ক্লোট্রিমাজোল ৫০০ মিলিগ্রাম পাওয়া যায় এবং তা খুব জটিল ও পুনরাবর্তিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ১ বার করে ব্যবহার করে ৬ সপ্তাহ ব্যবহার করা যাবে। ফ্লোকোনাজোল (১৫০ মিলিগ্রাম) ও ইট্রাকোনাজোল হলো ছত্রাক বিরোধী ঔষধ যা মুখে সেবন করা যায়। তবে উপরোক্ত সব ঔষধগুলো শুধুমাত্র গাইনোকোলোজিস্টের পরামর্শ দেয়ার পর গ্রহণ করতে হবে কেননা সংক্রমণের পরিমাণ অনুযায়ী ঔষধ পরিবর্তিত হতে পারে।


ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজিনোসিস

এই সংক্রমণের লক্ষণগুলো হলো, যোনি থেকে বিশেষ করে মাসিকের সময় ও যৌন মিলনের পর আঁশটে গন্ধ বের হওয়া এবং জ্বালাপোড়া ও বাদামী স্রাব হওয়া। এধরণের সংক্রমণ গর্ভবতী  মহিলাদের জন্য বিপদজনক কেননা এটি গর্ভথলির পানি (অ্যামনিওটিক ফ্লুইড) ফুটো করতে পারে এবং এতে গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। এ ধরণের সংক্রমণ সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় এবং এই সংক্রমণে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে গিয়ে অপকারী ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্টি হয়। এই সংক্রমণের আরো দুইটি কারণ হচ্ছে ধূমপান এবং দুশ্চিন্তা বা চাপ-এ থাকা। ভ্যাজাইনাল(যোনি) ক্রীম ব্যবহার অথবা মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিক যেমন মেট্রোনিডাজোল (৫০০ মিলিগ্রাম) বা ক্লিনডামাইসিন দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা করা যায়। গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে মেট্রোনিডাজোল গ্রহণ পরিহার করুন। কিছু কিছু নারীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা পুনর্বার গ্রহণ করা লাগতে পারে। উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজিনোসিস সহজেই প্রতিহত করা যায়।


ভ্যাজিনাল ট্রাইকোমোনিয়াসিস

এটি এক ধরণের যৌন সংক্রমণ তাই উভয় সঙ্গীরই চিকিৎসা গ্রহণ করা লাগে। উপসর্গ প্রকাশ ছাড়াই বছরের পর বছর উভয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের মধ্যেই এই সংক্রমণ সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো হলুদ, সবুজ বা পাতলা ধূসর যোনি স্রাব যা মাসিকের সময় খারাপ অবস্থা ধারণ করে। আরো বৈশিষ্ট্য হলো প্রস্রাবের সময় জ্বলা, চুলকানি ও অস্বস্তিবোধ হওয়া। যদিও পুরুষেরা সাধারণত উপসর্গমুক্ত থাকেন, তবে তারা তাদের সঙ্গীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারেন তাই তাদের ও চিকিৎসা গ্রহণ প্রয়োজন। শরীরের তরলের মধ্যে এই অণুজীবরা কয়েক ঘন্টা বেঁচে থাকতে পারে তাই ঐ রকম আবহাওয়ায় এবং সংক্রমিত হওয়া নিশ্চিত হলে পরিধেয় কাপড় শেয়ার করে পড়া থেকে বিরত থাকুন। এই সংক্রমণের চিকিৎসা হল মেট্রোনিডাজোলের একটি একক বড় ডোজ (২ গ্রাম অথবা ৫০০ মিলিগ্রামের পৃথক ৪টি ট্যাবলেট) অথবা কয়েকটি ছোট ডোজ (৪০০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট প্রতিদিন ২টি করে ৫ দিন গ্রহণ)। পরের পদ্ধতিটি কম জটিলতা যুক্ত এবং স্তন্যপান করানো মায়েদের জন্য উপযুক্ত। ভ্যাজিনাল ট্রাইকোমোনিয়াসিসের সাথে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো হলো গর্ভপাত, গর্ভথলীর পানি ফুটো হয়ে বের হওয়া যাতে শিশু মারা যেতে পারে এবং এটি এইডসের ঝুঁকি বাড়ায়।

যোনি থেকে স্রাবের আরো কিছু কারন হলো, সার্ভাইক্যাল ক্ষত ও সার্ভাইক্যাল পলিপ।

গর্ভাবস্থা, মাসিক, বয়ঃসন্ধি, যৌন উত্তেজনা এবং মুখে সেবনকৃত গর্ভনিরোধক ঔষধের ফলেও যোনি থকে স্রাব নিঃসরণ হতে পারে তবে এগুলো সাধারণত প্রচুর পরিমাণে হয় না এবং সহজে অসুখজনিত কারনে নিঃসৃত স্রাব থেকে আলাদা করা যায়।

নারীদের যোনি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ এবং তার সঠিক যত্ন নেয়া প্রয়োজন । যোনিতে যেকোন অস্বস্থি বা অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

সূত্রঃ মায়াআপা
নারী যৌনাঙ্গের সঠিক যত্ন – না বলা সমস্যাসমূহ নারী যৌনাঙ্গের সঠিক যত্ন – না বলা সমস্যাসমূহ Reviewed by Solution and Tips on December 05, 2018 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.