গলা ব্যথা ও তার সমাধান

নানা কারণে গলা ব্যথা হয়ে থাকে। গলা ব্যথার উপশমে কিছু ঘরোয়া চিকিৎসা ও চিকিৎসকের পরামর্শ দেয়া গেল। 

১। গলা ব্যাথার জন্য গরম পানীয় খুব কার্যকর। আদা চা, কফি, মধু মিশানো জল, গরম দুধ প্রভৃতি পান করতে হবে। 
২। গলা ব্যথা বেশি হলে শীঘ্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। অনেক সময় টনসিল ফুলে গলা ব্যথা হয়ে থাকে।  সেক্ষেত্রে পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। 
৩। গলা ব্যথার সঙ্গে যদি ঢোক গেলার সময় কাঁটা কাঁটা অনুভূতি হয় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গ্ল্যান্ড ফুলে, গ্ল্যান্ডে ইনফেকশন হলে এরকম হয়ে থাকে। সময়মত চিকিৎসা না করালে পরবর্তীতে এটি থেকে জ্বর ও অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

উপরোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করলে এসব সমস্যা থেকে অনেকখানি সমাধান পাওয়া যায়। তবে একটি প্রবাদ আছে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো। শীতকালে পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরতে হবে। ভোর সকালে বা সন্ধ্যায় বের হওয়ার সময় মাথা ঢেকে বের হন। মাফলার, টুপি প্রভৃতি ব্যবহার করুন। মাথায় কুয়াশা পড়লে তা থেকে মারাত্মক ঠাণ্ডা লেগে থাকে। যাদের টনসিলের সমস্যা আছে তাদেরকে অবশ্যই গলা ঢেকে রাখতে হবে। ঠান্ডা পানীয় পান, ঠাণ্ডা জল ব্যবহার যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। ঋতু পরিবর্তনের ফলে হঠাৎ ঠাণ্ডা লাগা, খুব সহজেই ঠাণ্ডায় গলা ব্যথা হওয়া, অতিরিক্ত গরম সহ্য করতে না পেরে ঢক ঢক করে ঠাণ্ডা পানি গিলে ফেলার কারণে অনেক সময়েই গলা ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়। খুসখুসে কাশি আর জ্বরও অনেক সময় গলা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় কণ্ঠনালীতে সংক্রমণ হয়, প্রদাহ হয়, অনেক সময় টনসিল এবং অন্যান্য গ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা করে৷ তাই এসকল সমস্যা প্রতিরোধের জন্য সবসময় সচেতন থাকতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ মেনে চলতে হবে। 

গলা ব্যথা রোধের ছয়টি পরামর্শ

গার্গলঃ গবেষণায় পরিলক্ষিত যে, কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবন মিশিয়ে গার্গল করা, শুধুমাত্র গলার জীবাণুকেই ধ্বংস করে না, প্রদাহ ও ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। তাই এক কাপ হালকা গরম পানিতে আধা চা চামচ লবন মিশিয়ে দিনে দুই তিন বার গার্গল করা প্রয়োজন। 

তরল খাবারঃ হাঁচি, কাশি ও গলার ভিতর প্রচুর তরল নিঃসরণের জন্য শরীর অনেকটাই পানিশুন্য হয়ে পড়ে। তাই প্রচুর পানি ও তরল খাবার খেতে হবে। তবে অবশ্যই ঠাণ্ডা পানি বর্জন করা প্রয়োজন। গলা ব্যাথায় ধোঁয়া উঠা গরম সূপ দারুণ কাজে দেয়। 

লজেন্সঃ মেনথল, ইউক্যালিপটাস বা ফেনলসমৃদ্ধ কিছু লজেন্স আছে, যা চুষার ফলে গলা ব্যাথা ও প্রদাহ কমে যায়। এগুলো মূলত ক্লোরোসেপটিক অর্থাৎ গলায় একটা আরামদায়ক অনুভূতি এনে দেওয়ার পাশাপাশি জীবাণুনাশক হিসেবেও কাজ করে৷

চাঃ গলা ব্যাথায় দিনে দুই তিনবার গরম চা আমাদের অনেকটাই আরাম দিতে পারে। সেক্ষেত্রে গ্রিন টি বা হারবাল চা অনেক বেশি কার্যকর। চাইলে চায়ের মধ্যে লেবুর রস বা লবঙ্গ জাতীয় জিনিস যোগ করুন, যা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করবে৷

বিশ্রামঃ যেকোনো অসুখে প্রজাপ্ত বিশ্রাম গ্রহন করলেই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠা যায়। তাই কাজ থেকে ছুটি নিন, অবকাশ যাপন করুন, দেখবেন খুব দ্রুত আপনার গলা ব্যাথা সেরে যাবে। 

ওষুধঃ গলা ব্যাথায় প্যারাসিটামল বা বেদনানাশক ওষুধই যথেষ্ট। তবে ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে গলায় স্ট্রেপটোকক্কাস সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে৷ সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে৷ তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 

আশা করি উপরিউক্ত নিয়োম মেনে চললে আপনার গলা ব্যথা কমে যাবে। আপনি সুস্থ থাকতে পারবেন আগের চেয়েও অনেক বেশি।

সিটি হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগের পরামর্শক ডা. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান কাছে করা কিছু প্রশ্নের উত্তরঃ

প্রশ্ন : গলা ব্যথার প্রধান কারণগুলো কী কী?

উত্তর : কারণ অনেক রয়েছে। এর মধ্যে মানুষ যে সমস্যার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটা হচ্ছে ক্রনিক টনসিলাইটিস, ক্রনিক ফ্যারেনজাইটিস। এগুলোই বাংলাদেশে বেশি হয়ে থাকে। তবে আরো কিছু কারণও আছে। যেমন : ট্রমাটিক আলসার, মুখের মধ্যে যদি কোনো ফাংগাল ইনফেকশন হয়ে থাকে, ম্যালিগনেন্সি অর্থাৎ ক্যানসার সম্পর্কিত বিষয় যদি থেকে থাকে, জিহ্বায় যদি কোনো ঘা হয়ে থাকে, তখনো সাধারণত গলা ব্যথা হয়।

প্রশ্ন : কী কারণে গলা ব্যথা হচ্ছে সেটি বোঝার কি কোনো উপায় আছে?

উত্তর : রোগীরা সাধারণত বলেন যে ‘গলা ব্যথা করছে’,  ‘দুই থেকে তিন দিন ধরে গলা ব্যথা’- উপসর্গ তো এমনই! এ ছাড়া খেতে গেলে গলা ব্যথা, ঢোক গিলতেও ব্যথা, গায়ে ব্যথা, জ্বর, খাওয়ায় অরুচি- সাধারণত এগুলোই উপসর্গ।

প্রশ্ন : বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, টনসিলাইটিসটা আসলে স্কুলে যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি হয়। এর কারণ কী?

উত্তর : টনসিলাইটিস শিশুদের বেশি হয়ে থাকে। টনসিলাইটিস, ফ্যারেনজাইটিস-এর প্রধান কারণ ভাইরাস। সাধারণত এই রোগের ৯০ শতাংশই ভাইরাসের কারণে হয়। যেসব শিশুর শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে, এরাই এই সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হয়। আর ভাইরাস সংক্রমণের প্রথম স্থানই হচ্ছে গলা। এ জন্য শিশুরা অল্পতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন : গলা ব্যথা যদি টনসিলাইটিস, ফ্যারেনজাইটিসের জন্য হয়, তখন কী ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়?

উত্তর : টনসিলাইটিসের ক্ষেত্রে টনসিল লাল হয়ে যাবে। জ্বর থাকবে গায়ে, শরীর ব্যথা করবে, কোনো কিছু ভালো লাগবে না। ফ্যারেনজাইটিসের ক্ষেত্রেও আসলে একই রকম লক্ষণ  হয়ে থাকে।

প্রশ্ন : এ-জাতীয় রোগ নিয়ে যখন রোগী আসছে, তখন আপনারা কী করে থাকেন?

উত্তর : টনসিলাইটিস নিয়ে আসলে আমরা তাকে প্রচুর পানি খেতে বলি। লবণপানি গার্গল করতে বলা হয়। মাউথওয়াশ দিয়ে থাকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে। পাশাপাশি গরম পানির বাষ্প নাক দিয়ে টেনে মুখ দিয়ে ছাড়তে পারলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। এই কাজ সকালে, দুপুরে, রাত্রে করতে পারলে খুব ভালো হয়। এক ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ দিই। অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধও দেওয়া হয়।

প্রশ্ন : অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যাদের ফ্যারেনজাইটিস বা গলার প্রদাহ হয়, তারা ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে নিয়ে খাওয়া শুরু করে দিল। আবার হয়তো সম্পূর্ণ কোর্স শেষও করল না। এই ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : এটা আসলে খুব খারাপ অভ্যাস বলে আমি মনে করি। জেনে রাখা ভালো, টনসিলাইটিস, ফ্যারেনজাইটিস- ভাইরাস দিয়ে হচ্ছে। ব্যাকটেরিয়া দিয়ে হচ্ছে না। তাই বিনা কারণে এটি গ্রহণ করলে অ্যান্টিবায়োটিকের কর্মক্ষমতা কমে যায়।

প্রশ্ন : এই ক্ষেত্রে রোগীদের প্রতি পরামর্শ কী থাকবে?

উত্তর : এসব রোগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।  যথাসম্ভব অযথা অ্যান্টিবায়োটিক না সেবন করা উচিত।

প্রশ্ন : ফ্যারেনজাইটিসের ক্ষেত্রে চিকিৎসাটা কী থাকে?

উত্তর : গার্গল, মাউথওয়াশ, অ্যান্টি হিসটামিন- সাধারণত এগুলোই চিকিৎসায় দেওয়া হয়। কখনো কখনো অ্যান্টিবায়োটিক দিলেও, সেটা দেওয়া হয় পরিস্থিতি বুঝে। 

প্রশ্ন : অনেক রোগীর হয়তো বারবার সমস্যাটি হয়। সে চিকিৎসকের কাছে অভিযোগ নিয়ে যায়- রোগটি সারছে না। এমন ক্ষেত্রে আপনারা কী করেন?

উত্তর : অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয়ে থাকে। টনসিলাইটিসের ক্ষেত্রে আমরা সার্জারি করতে বলি। যদি সমস্যাটি তিন-চার বছর ধরে চলতে থাকে এবং বছরে তিনবার ব্যক্তি আক্রান্ত হয়, তখন আমরা টনসিল ফেলে দিতে বলি। অথবা রোগী হয়তো এক বছর ধরে ভুগছে এবং বছরে পাঁচবার আক্রান্ত হচ্ছে তখনো আমরা টনসিল ফেলে দিতে বলি।

প্রশ্ন : শিশুদের ক্ষেত্রে টনসিলাইটিসের সময় যখন সার্জারির বিষয়টি আসে, তখন বাবা-মা একটু ভয় পেয়ে যান। এই ব্যাপারে আপনাদের পরামর্শ কী?

উত্তর : শিশুদের ক্ষেত্রে আসলে টনসিলটা একটু বড় থাকে। সাধারণত তিন-চার বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। তখন বাবা-মা ভয় পেয়ে যান। এতে আসলে ভয়ের কিছু নেই। এটা একটা পর্যায়ে ছোট হয়ে যাবে। আর যদি টনসিলাইটিসের সঙ্গে এডিনয়েড থাকে (এডিনয়েড নাকের পেছনে থাকে), সেটি যদি বড় হয়ে যায়, তখন শিশুর কিছু সমস্যা হয়। এর ফলে শিশুটি নাক ডাকে। অনেক সময় শিশুটি খেতে পারে না। এডিনয়েড থাকার কারণে কানের ঘা বা ইনফেকশন হতে পারে। রাইনাইটিস হতে পারে, হয়তো সর্দি ভালো হয় না। এসব ক্ষেত্রে আমরা এক্স-রে করি। দেখি এডিনয়েডের কী অবস্থা। যদি দেখি বেশি সমস্যা, তখন সার্জারি করতে বলি। অনেক  সময় এডিনয়েড ছোট থাকে, তখন সাধারণ চিকিৎসাই দিয়ে থাকি। আর এতেও ভালো না হলে সার্জারি করি।

প্রশ্ন : টনসিল শরীরে রোগ প্রতিরোধ করার জন্য একটি বড় অংশ। যখন সার্জারি করতে বলা হয়, তখন বাবা-মা এই ভেবে ভেঙে পড়েন যে কেন আমার শিশুটি টনসিল হারাবে। সে ক্ষেত্রে যদি কোনো পরামর্শ থাকে...

উত্তর : আসলে টনসিল শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, কথাটি সঠিক। এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে। তবে যদি এটি সংক্রমিত হয়, তখন আর পুরোপুরি কাজ করতে পারে না। তখন অন্যান্য সংক্রমণে উৎস হিসেবেও কাজ করে। তখন এ থেকে আরো অনেক ধরনের রোগ হয়ে থাকে। যেমন : রিউমেটিক ফিভার, টনসিলের আশপাশের অংশে ঘা ইত্যাদি। সে ক্ষেত্রে টনসিল যদি বেশি সংক্রমিত হয়ে যায়, রোগীর দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়। তখন এটি ফেলে দেওয়াই ভালো।

প্রশ্ন : ফ্যারেনজাইটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী হবে, বিশেষ করে এর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে?

উত্তর : ফ্যারেনজাইটিসের কিছু কারণ আছে। একটি হচ্ছে অ্যালার্জি। কিছু ক্ষেত্রে এসিডিটিও কারণ। সাধারণ চিকিৎসাই বেশি দিই। প্রচুর পানি খেতে বলি। নিয়মিত গার্গল করতে বলি। মেনথলের বাষ্প নাক দিয়ে (মেনথল স্টিম  ইনহিলেশন ) নিতে বলি। এটা বেশ ভালো কাজ করে। অ্যান্টি আলসার, অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ দিই। সাধারণত এগুলোতেই রোগী ভালো হয়ে যায়।

Post a Comment

Previous Post Next Post