ব্রণ এর ইংরেজী প্রতিশব্দ আছে দুটি Pimple আর Acne। বাংলা ভাষায় দুটির অর্থ এক হলেও, ইংলিস দুটি শব্দের হিসাবটা একটু আলাদা। ইংরেজিতে Acne হল এক প্রকারের ঘা, যা দীর্ঘমেয়াদি ও শরীলের যেকোন জায়গায় হতে পারে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে পযন্ত সাধারণত এটা দেখা দেয়, আর এটার কারণে মুখে দীর্ঘমেয়াদি দাগ থেকে যেতে পারে আর Pimple হল মুখের মৃত কোষ দ্বারা গঠিত এক প্রকার দাগ, যেটা সাধারণত যেকোন সময়ে হতে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালে লিঙ্গ নির্বিশেষে টেস্টোস্টেরন এর মত অ্যান্ড্রোজেন বৃদ্ধির ফলে ব্রণ হতে পারে। ত্বকের উপর তৈলাক্ত গ্রন্থির মাত্রার উপর ব্রণ হওয়া নির্ভর করে। ব্রণের অনেক ধরনের চিকিৎসা আছে। স্বল্প পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট যেমন চিনি খাওয়া যেতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা ব্রণের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে বিনাশ করে। বয়ঃসন্ধিকালে ব্রণ বেশি হয়, পাশ্চাত্যে যার পরিমাণ ৮০-৯০%। গ্রাম্য সমাজে এর মাত্রা কম। ২০১০ সালে সারা বিশ্বব্যাপী ৬৫০ মিলিয়ন মানুষের ৮ম সাধারণ রোগ হিসেবে এটি নির্ণীত হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ মানুষের ব্রণ কমে যায় এবং ২৫ বছরের মধ্যে একেবারে নির্মুল না হলেও একদমই কমে যায়। ফলে, ব্রণ কবে একেবারে শেষ হয়ে যাবে, তা পূর্বানুমান করা যায় না। কিছু কিছু মানুষের ৩০-৪০ বছরের পরেও ব্রণ থাকতে দেখা যায়।

কারণ

হরমোন

মাসিক চক্র এবং বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের মাত্রাধিক্যের কারণে ব্রণ হয়। বয়ঃসন্ধিকালে, অ্যান্ড্রোজেন বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত সিবাম তৈরি হয়। গর্ভকালীন সময়েও অ্যান্ড্রোজেন বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত সিবাম তৈরি হয়। এছাড়াও কিছু হরমোন ব্রণের সাথে সম্পর্কযুক্তঃ টেস্টোস্টেরন, ডিহাইড্রোএপিএন্ডোস্টেরন।

পরবর্তী জীবনে ব্রণ হওয়া অস্বাভাবিক, যদিও ব্রণের মতই আরেক ধরনের উপস্থিতি থাকতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্ক নারীর ব্রণের পেছনে কারণ হিসেবে গর্ভধারণের মত স্বাভাবিক বিষয় থেকে শুরু করে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা কুশিং সিন্ড্রোম থাকতে পারে।

জেনেটিক

কিছু ব্যক্তির ব্রণের পেছনে জেনেটিক উপাদান যেমন TNF-আলফা, IL-1 আলফা ইত্যাদি দায়ী বলে মনে করা হয়, যা যমজ গবেষণা দ্বারা সমর্থিত। এসব প্রচলিত মেন্ডেলের বংশগতির পোষকের প্যাটার্নকে অনুসরণ করে না।

মানসিক

অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে ব্রণ বাড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ দুশ্চিন্তাকে ব্রণ বৃদ্ধিকারক একটি এজেন্ট বলে উল্লেখ করেছে।

সংক্রমণ

Propionibacterium acnes একটি অবায়বিয় (Anerobic) ব্যাক্টেরিয়ার প্রজাতি যা ব্রণের পেছনে অনেকাংশে দায়ী, যদিও শুধুমাত্র P. acnes দ্বারা কলোনী সৃষ্টির পর Staphylococcus aureus কেও দায়ী করা হয়। তারপরেও, P. acnes এর বিশেষ কিছু জাত দীর্ঘমেয়াদি ব্রণের সমস্যার সাথে সম্পর্কযুক্ত। P. acnes এর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ দিন দিন বাড়ছে। Demodex নামক পরজীবির দ্বারা সংক্রমণের ফলেও ব্রণ হতে পারে।

ব্রণ দূর করার ছয়টি ঘরোয়া উপায়

ব্রণ দূর করার জন্য বাজারে যেসব প্রসাধনী পাওয়া যায়, সেগুলোয় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। এগুলো ব্রণ তো দূর করেই না, বরং কেমিক্যালের কারণে ত্বক কালচে ও রুক্ষ হয়ে যায়। তাই এসব পণ্য ব্যবহার না করে ঘরোয়া উপায়ে এর সমাধান করা নিরাপদ। 

এসপিরিন

নিউইয়র্কের ডার্মাটোলজিস্ট এবং স্কিন রুলস বইয়ের লেখক ডেবরা জেলিমান জানান, এসপিরিন হলো এক ধরনের সলিসিলিক এসিড। একনি বা ব্রণ দূর করার পণ্যগুলোতে এই উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসপিরিন গুঁড়ো করে পানি দিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। তুলার মধ্যে লাগিয়ে এই পেস্ট সরাসরি ব্রণের মধ্যে ১০ মিনিট রাখুন। এর পর উষ্ণ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।  

চা-গাছের তেল

চা-গাছের তেলের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-সেপটিক ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান। কয়েক ফোঁটা চা-গাছের তেল তুলার মধ্যে লাগিয়ে খুব নরমভাবে ব্রণ ও দাগে লাগান। দেখবেন কয়েক দিনের মধ্যে ব্রণ সেরে উঠেছে।  

বরফ

ড. জেলিমান জানান, গোড়ালি মচকে গেলে এর ফোলা কমাতে বরফ কাজ করে। এটি ব্রণের প্রদাহ কমাতেও বেশ কার্যকর। একটি বরফের ছোট টুকরো পরিষ্কার কাপড়ের মধ্যে নিয়ে এক মিনিটের জন্য ব্রণের মধ্যে রাখুন। এই পদ্ধতি ব্রণের লাল হওয়া ও ফোলাভাব কমাবে।

লেবুর রস

লেবুর রসের মধ্যে রয়েছে সাইট্রিক এসিড। রয়েছে এল-এসকোরোবিক এসিড, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টি অক্সিডেন্টের উৎস। একটি তুলোর টুকরোর মধ্যে লেবুর রস মিশিয়ে ব্রণে লাগান। সারা রাত রাখুন। ব্রন দূর করতে এই পদ্ধতিও বেশ কার্যকর।

রসুন

রসুনের গন্ধ হয়তো আপনার বিরক্ত লাগতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান; যা ব্রণ দূর করে। রসুন দেহের বিভিন্ন রোগ-প্রতিরোধেও উপকারী। এটি ক্যানসার প্রতিরোধ করে। রসুনে রয়েছে এলিসিন ও অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। রসুন কেটে পানির সঙ্গে পেস্ট করুন। এরপর ব্রণের মধ্যে পাঁচ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

মধু

ব্রণ দূর করতে মধুও খুব উপকারী। মিষ্টি স্বাদের এই খাবারটি আপনি মাস্কের মতো মুখে লাগাতে পারেন। পাঁচ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। এরপর ধুয়ে ফেলুন। এর ভেতর আছে অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি এবং অ্যান্টি সেপটিক উপাদান। তবে নিয়মিতি মধু ব্যবহারে ব্রণ একেবারেই সারবে কি না, সেটা নিয়ে গবেষকরা এখনো দ্বন্দ্বে রয়েছেন। তাঁদের পরামর্শ, চেষ্টা করুন অপ্রক্রিয়াজাত বা টাটকা মধু ব্যবহার করতে।


এক দিনেই ব্রণ দূর করুন!

সরিষা ও মধু

সরিষাতে প্রচুর পরিমাণে স্যালিসিলিক এসিড রয়েছে, যা খুব সহজেই ব্রণের জীবনুকে ধংস করে। সামান্য সরিষা গুঁড়োর সঙ্গে এক চা চামচ মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন, আপনার ব্রণ দূর হওয়ার পাশাপাশি ব্রণের দাগও দূর হবে।

গ্রিন টি এর আইস কিউব

বেশি করে গ্রিন টিয়ের পাতা দিয়ে কড়া চা তৈরি করে নিন। এবার এই চা আইস ট্রেতে রেখে কিউব তৈরি করে নিন। এবার এই আইস কিউব দিয়ে ব্রণের ওপর ভালো ভাবে ঘষুন। এতে ব্রণের ফোলা ভাব ও চুলকানি কমে যাবে।

টমেটো স্লাইস

টমেটো ত্বকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কাজ করে। এটি ব্রণ দূর করার পাশাপাশি ত্বকের অন্যান্য ইনফেকশনজনিত সমস্যাও দূর করে। দিনে অন্তত দুইবার টমেটোর স্লাইস দিয়ে ত্বক ভালোভাবে ঘষুন। এটি আপনার ত্বকের ব্রণ তৈরির ছত্রাক ধংস করবে।

রসুনের রস

যে কারণে ব্রণ তৈরি হয়, সেই জীবাণু ধ্বংস করতে রসুনের রস বেশ কার্যকরী। সামান্য পরিমাণে রসুনের রস ব্রণের ওপর দিয়ে রাখুন। এবার শুকিয়ে গেলে মুখ ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। রসুনের ঝাঁঝ ব্রণের চুলকানি দূর করবে এবং ব্রণের জীবাণু চিরতরে ধংস করবে।

ডিমের সাদা অংশের মাস্ক

প্রথমে মুখের যেখানে যেখানে ব্রণ আছে, সেগুলোর ওপর লেবুর রস দিন। এবার পুরো মুখে ডিমের সাদা অংশ মাস্কের মতো করে লাগান। ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ব্রণ দূর করার পাশাপাশি মুখের কালচে ভাবও দূর করবে। 

অ্যাপল সিডার ভিনেগার

ব্রণ দূর করার আরেকটি কার্যকরী উপায় হলো অ্যাপল সিডার ভিনেগার। একটি তুলার বলে অ্যাপল সিডার ভিনেগার লাগিয়ে ব্রণের ওপর লাগান। পাঁচ মিনিট রেখে দিন। দিনে অন্তত তিন থেকে চার বার এভাবে তুলা দিয়ে অ্যাপল সিডার ভিনেগার লাগান। দেখবেন, অনেক দ্রুত আপনার ব্রণ দূর হয়ে যাবে। 

মুলতানি মাটি ও তেল

এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটির সঙ্গে কয়েক ফোঁটা অ্যাসেনশিয়াল অয়েল ও পানি মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে মুখে লাগান। ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার পানি দিয়ে ভালোকরে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন, এক রাতের মধ্যেই আপনার মুখের ব্রণ দূর হয়ে যাবে।

লেবুর রস

ঘুমানোর আগে তুলায় লেবুর রস লাগিয়ে ব্রণের ওপর দিয়ে রাখুন। এভাবে সারারাত রেখে দিন। দেখবেন, সকালে ব্রণ শুকিয়ে যাবে এবং নিজে থেকেই মুখ থেকে খসে পড়বে।

ধন্যবাদ
আমাদের পোষ্টি ভালো লেগে থাকলে, Follow By Email এ গিয়ে, আপনার ই-মেইল দিন।


Post a Comment

Previous Post Next Post