চুল পড়া সমস্যা ও তার সমাধান

শুধু নারীরা নন, চুল পাড়া সমস্যায় বিচলিত হয়ে পড়েন পুরুষরাও। চুলের চরিত্র যেমনই হোক চুল নিয়ে চিন্তা নেই, এমন মানুষ বিরল। প্রায় প্রতিটি মানুষকেই বলতে শোনা যায় প্রচুর পরিমাণে চুল উঠে যাচ্ছে বা গোড়া থেকে চুল পড়ে যাচ্ছে। চুল পড়ে যাওয়া এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। চুল পড়া তো স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত চুল পড়া আতঙ্কের। এ আতঙ্ক চিরতরে দমন করতে হলে সমস্যার সঠিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। প্রথমেই অস্বাভাবিক হারে চুল ঝরে যাওয়ার কারণগুলো জেনে নেয়া যাক। পরামর্শ দিয়েছেন হার্বস আয়ুর্বেদিক স্কিন কেয়ার ক্লিনিক শাহিনা আফরিন মৌসুমী।

প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব ও খাবারের সমস্যা : চুল পড়ার অন্যতম কারণ অপুষ্টি। চুল ও ত্বকে পুষ্টি সাধন হয় দেহের পুষ্টি থেকে। চুলের স্বাস্থ্য দৈহিক স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। ত্বকে ডারমিস স্তরে যে হেয়ার ফলিকল থাকে, সেখানে থাকে অজস্র রক্তবাহী নালিকা। এরাই চুলে পুষ্টি বহন করে আনে। যেসব খাবার প্রতিদিন আমরা গ্রহণ করে থাকি তা থেকে পুষ্টি আসে। অতএব সুষম খাবার যদি না গ্রহণ করি, তা হলে চুলেও ঠিকমতো পুষ্টি পৌঁছাবে না। ফলে অকালে ঝরে যাবে চুল।

খাবারের অনিয়ম, অস্বাস্থ্যকর ডায়েট, লো প্রোটিন ডায়েট, আয়রন ডেফিশিয়েন্সি ইত্যাদি চুল পড়ারও অন্যতম কারণ।

কেমিক্যাল হেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার ও হিট ট্রিটমেন্ট :

অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং তার প্রভাবে চুল পড়ে যায়। ভেঙে যায়। চুল পড়ার অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে ক্রমাগত বা গরম কিছু ব্যবহার। ব্লোড্রায়ার, আয়রন এগুলো যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করুন। হেয়ার ড্রায়ার নিয়মিত ব্যহারে চুল গ্লো-হীন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় চুলের আর্দ্রতা হারিয়ে গিয়ে, চুল ঝরতে শুরু করে। চুলের স্টাইলের জন্য গরম তাপ ব্যবহার করার আগে, চুল অবশ্যই সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হবে। এসব কারণে কিছু ক্ষেত্রে ফলিকল গ্রন্থি, মানে যে গ্রন্থি থেকে চুল হয় সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে চুল গজায় না।

পলিউশন : অতিরিক্ত ধুলাবালু, পরিবেশের দূষণের প্রভাব, রাস্তায় ধোঁয়া, সূর্যের ইউ-ভি রে, পানি সমস্যা, সুইমিং পুলের পানিতে থাকা ক্লোরিন মারাত্মকভাবে চুলের ক্ষতি করে এবং চুল ঝরাতে সাহায্য করে।

মানসিক চাপ : মানসিক দুশ্চিন্তা, স্ট্রেস, ডিপ্রেশনের ফলে শরীরে নানারকম হরমোনাল রদবদল হয়। তার প্রভাব পড়ে স্ক্যাম্পে। ফলে চুল পড়ে যায়।

গর্ভাবস্থা ও থাইরয়েড : সন্তান জন্ম দেয়ার পর বা সন্তান ধারণের সময় প্রায়ই মায়ের চুল পড়ে যায়। কারণ এ সময় হরমোনাল ভারসাম্য হয়। থাইরয়েডের মাত্রা কম-বেশি হওয়ার কারণে চুল পড়ে। আবার যাদের শরীরে অ্যান্ড্রাজেনিক হরমোনের প্রভাব বেশি, তাদেরই বেশি করে চুল পড়ে। নারীর মেনোপজের সময় অ্যান্ড্রে াজেনিক হরমোন আনুপাতিক হারে বেড়ে যায়। তখন হঠাৎ চুল বেশি করে পড়তে শুরু করে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করলেও চুল পড়তে পারে অনেকের।

চুলের সঠিক যত্ন না নেয়া : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাই আসলে চুল ও স্ক্যাল্পের সবচেয়ে বড় যত্ন। চুলের সঠিক যত্নের জন্য প্রথমেই চুলের সঠিক ধরন জেনে নেয়া জরুরি। চুলের ধরন বুঝে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন। ঝরে পড়া চুল রোধ করতে প্রয়োজন সঠিক যত্ন-পরিচর্যা।

খুশকি ও মাথার ত্বকে সংক্রমণ : চুলের অন্যতম শত্রু হল খুশকি। অয়েলি ও ড্রাইয়ের দু’রকম খুশকি ক্ষতিকারক। অয়েলি খুশকি থেকে দ্রুত চুল পড়া শুরু হয়। ড্যানড্রাফ হল চুলের সাইলেন্ট কিলার। তাই খুশকির প্রতিকার করতে হবে দ্রুত। এলোপেসিয়ার কারণেও চুল পড়তে পারে। ফাঙ্গাল ইনফেকশনও চুল পড়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। গরমকালে ফাঙ্গাল ইনফেকশন হয় বেশি। প্রকোপ বাড়ে বর্ষায়।

এ ছাড়া চুল হারানোর পেছনে কিছু কারণ থাকে যেমন-

বংশগত, ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারানো, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, হরমোন, মানসিক সমস্যার ওষুধ সেবন করলে, ঘুমের অনিয়ম, সঠিক নিয়মে পানি পান না করা ইত্যাদি কারণে চুল পড়ে যেতে থাকে।

চুল পড়ার প্রতিকার : কী কারণে চুল পড়ছে তা নির্ধারণ করে তার প্রতিকার করা প্রয়োজন। শরীরের পুষ্টির ওপর চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে। তাই চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে দরকার ব্যালেন্সড ডায়েট। সেখানে কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাটের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। এ ছাড়া ভিটামিন A, D, C, E, বি-কমপ্লেক্স এবং খনিজ পদার্থও ডায়েটে থাকা প্রয়োজন।

চুলের যত্ন : আমাদর প্রত্যেকের চুলের ধরন আলাদা তাই চুলের ধরন বুঝে যত্ন নিন এবং নিজের চুল ভালোবাসুন।


  • যত্নের প্রথমেই খুশকি এড়াতে চুলকে সবসময় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • নিয়মিত শ্যাম্পু করুন। অবশ্যই মাইন্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
  • চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ফ্রিজমুক্ত রাখতে ময়েশ্চারাইজিং শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
  • তোয়ালে চেপে চুল শুকাবেন। এরপর আঙুল দিয়ে ঝেড়ে ফেলুন। তবে তোয়ালে দিয়ে চুল ঘষবেন না।
  • আঁটসাঁট বা টাইট করে চুল বাঁধবেন না।
  • ব্লো ডাই করার সময় ড্রাইয়ারের মুখ থাকবে গোড়া থেকে চুলের আগার দিকে, তাতে চুলের কিউটিকল ভাঙবে না।
  • কাঁচা পেঁয়াজের রস মাথার তালুতে ঘষে ঘষে লাগালে নতুন চুল জন্মায়।
  • নারিকেল তেলের সঙ্গে আমলকীর রস মিশিয়ে লাগালে চুলের পুষ্টি হয়।
  • খুশকি দূর করতে ভিনিগার, আদার রস, পেঁয়াজের রস, জবাফুল বাটা মিশিয়ে লাগান।
  • নিজের চিরুনি, তোয়ালে কাউকে ব্যবহার করতে দেবেন না।
  • ভেজা চুল খুলে রাস্তায় বেরোবেন না।


ব্রাশিং : সব সময় বড় ধারার চিরুনি দিয়ে ভালো করে চুল আঁচড়ান। কাঠের চিরুনি হলে সবচেয়ে ভালো হয়। কখনই ভেজা চুল আঁচড়াবেন না। এতে চুল ছিঁড়ে যায়। চুল আধ শুকনা হলে আঁচড়ান। চুল আঁচড়ানোর ক্ষেত্রে কখনই জোরে বা শক্তি দিয়ে আঁচড়াবেন না। সঠিক পদ্ধতিতে চুল আঁচড়ালে চুলের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। চুল সামনে থেকে পেছনে কুড়িবার আঁচড়াতে হবে। এরপর মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে পুরো চুল উলটে নিয়ে মাথার পেছন থেকে সামনে কুড়িবার আঁচড়াতে হবে। এবার সব চুল একই দিকে নিয়ে আসুন। বাঁদিক থেকে ডানদিকে দশবার, আবার ডানদিক থেকে বাঁদিকে দশবার আঁচড়ে নিতে হবে। এতে রক্ত চলাচল বেড়ে যায় এবং সেই সঙ্গে চুলও ভালো থাকে।

Post a Comment

0 Comments