বিব্রতকর সাদাস্রাব (লিউকোরিয়ার) কি এবং প্রতিরোধে করণীয় (সম্পূর্ণ গাইড)

চিকিৎসা বিজ্ঞানে অতিরিক্ত এবং দুর্গন্ধ যুক্ত সাদাস্রাবকে লিউকরিয়া বলে। প্রতিরোধের জন্য জরায়ুর মুখ সবসময় পরিষ্কার এবং শুকনো রাখতে হবে। ভাজাপোড়া বাদ দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ২ চামচ টক দই খেলে উপকৃত হবেন। স্যানিটারি ন্যাপকিন ৫ ঘণ্টা অন্তর অন্তর বদলাতে হবে।



মেয়েদের এমন অনেক কথাই আছে, যা অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলেও ডাক্তার কে দেখাতে হবে ভেবে লুকিয়েই রাখা হয়। সাদা স্রাব বা লিউকোরিয়া তেমনি একটি বিষয়। মেয়েদের জীবনের কোনো না কোনো সময় তাদের কে এই সমস্যায় পড়তেই হয়। তাই কিছুটা জেনে রাখুন এখনি। বলা যায় না কখন আপনার জীবনে, আপনার বোন, মেয়ে অথবা বান্ধবী কিংবা আত্মীয় স্বজনের কাজে লেগে যায়। আগে জানতে হবে স্বাভাবিক সাদা স্রাব দেখতে কেমন হয়।

সাদা স্রাব – হলুদ , সাদা পিচ্ছিল ও আঠালো রঙের নিঃসরণ, যা শুকালে হালকা বাদামি-হলুদ রঙের বর্ণ ধারণ করে। যে সব মেয়েরা বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতে, তাদের জন্য বলছি নিজের অজান্তে যদি কাপড়ে এমন দাগ পড়ে তবে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। এটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য হতে পারে। নারীর রিপ্রোডাক্টিভ এইজে (১৪-৫০) যোনি দেয়াল পুরু থাকে। যোনিতে এক ধরনের জীবাণু থাকে, যা যোনির জন্য স্বাভাবিক। সেটি যোনি থেকে নিয়মিত খসে পড়া কোষের গ্লাইকোজেন কে ল্যাকটিক এসিডে পরিণত করে। এটি যোনিতে পিচ্ছিল ভাব আনে। পাশাপাশি এর অম্লতাও ঠিক রাখে। ক্ষতিকারক জীবাণু থেকে প্রজনন অঙ্গকে নিরাপদ রাখে।

সাদাস্রাব দুই প্রকারঃ

১) স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয়ঃ
  • বয়সন্ধিকালে রক্ত চলাচল বেড়ে যায় ফলে নিঃসরণ-ও বেশি হয়
  • যৌন মিলনকালে
  • যৌন আবেগে
  • গর্ভাবস্থায়
  • শরীরের রাসায়নিক সমতা বজায় রাখতে এবং যোনির কোষ গুলোকে সচল রাখতে oestrogen হরমোনের প্রভাবে এটি নিঃসৃত হতে পারে
  • মেয়ে শিশুর জন্মের প্রথম ৭-১০ দিনের মধ্যে এটি হতে পারে। মায়ের শরীরে যদি অত্যধিক হরমোন থাকে তবেও এটি হতে পারে।
  • সন্তান ডেলিভারির প্রথম কয়েকদিন-ও সাদা স্রাব বেশি হতে পারে
  • হস্তমৈথুন বা মাস্টারবেশন
  • অভুলেশন ( ডিম্বাণু নিঃসরণ কালে ) জন্ম বিরতিকরণ পিল ব্যবহার করলে। কাজেই প্রথমে ভয় না পেয়ে দেখুন ও বুঝে নিন আপনার সাদা স্রাব কি অত্যধিক কিনা বা স্বাভাবিক কিনা। তারপর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।
০২. রোগ সম্বন্ধীয়ঃ
  • মানসিক অশান্তি
  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টির অভাব
  • বিভিন্ন ধরনের ক্রিমির সংক্রমণ
  • অপরিচ্ছন্নতা এবং কাপড় সঠিক ভাবে না শুকিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে রাখলে
  • ইনফেকশন – যক্ষা, ছত্রাক (candida)
  • জন্ম বিরতিকরণ পিল খাওয়া
  • ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
  • পেটের নিম্নভাগের প্রদাহ
  • STD (sexually transmitted disease)
বয়ঃসন্ধির আগে এবং স্থায়ী ভাবে মাসিক বন্ধ হবার পরে নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ এ সময় সংক্রমণের আশংকা-ও বেশি থাকে। যদি স্রাবের সাথে রক্ত যায়, অথবা অতিরিক্ত নিঃসরণ হয় কিংবা অতি দুর্গন্ধ হয় তবে তা আশংকাজনক। বাচ্চা হওয়ার পর দুর্গন্ধ যুক্ত নিঃসরণ (lochia) এটাই নির্দেশ করে যে , জরায়ু তার গর্ভ ধারণের পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। ছত্রাকের সংক্রমণ হলে সাদা দুধের ছানার মত নিঃসরণ যেতে পারে। পাশাপাশি চুলকানো ভাব থাকলে এটি আরও বেশি ছত্রাকের প্রতি নির্দেশ করে।

অতিরিক্ত সাদাস্রাব-এর কারণ ও লক্ষন সমূহঃ

  • জরায়ুতে ব্যাকটেরিয়া জন্মালে। জরায়ু সব সময় ভেজা থাকে, তাই তাড়াতাড়ি ব্যাকটেরিয়া বাসা বাধতে পারে।
  • ছোঁয়াচে যৌন রোগ।
  • ইস্ট এর সংক্রামন ঘটলে।
  • অতিরিক্ত সাদা স্রাব-এ কোমরে ব্যথা করে।
  • গন্ধ যুক্ত সাদাস্রান নিঃসরণ।
  • তলপেট ভারি হয়ে থাকা
  • শরীর দুর্বল লাগা।
  • চোখের নিচ গর্ত হয়ে যাওয়া, চোখের নিচ কালো হয়ে যাওয়া।
  • বদ হজম।
  • জরায়ুতে চুলকানি অথবা জ্বালাপোড়া।
  • আন্ডার গার্মেন্টস এ দাগ লেগে থাকা।
  • মুখের মলিনতা নষ্ট হয়ে যাওয়া।

সাদাস্রাব রোগ নির্ণয়ে যে পরীক্ষাঃ

  1. ওয়েট স্মিয়ার
  2. গ্রাম স্টেইন
  3. কালচার
  4. প্যাপ স্মিয়ার
  5. বায়োপসি

সাদাস্রাব প্রতিরোধে করনীয়ঃ

  • কখনও অনেক সময়ের জন্য খালি পেটে থাকা যাবে না।
  • খুব বেশি জরায়ু চুলকালে কুসুম গরম পানিতে লবন দিয়ে, জরায়ুর মুখ ভালো করে ধুতে হবে।
  • জরায়ুর মুখ সবসময় পরিষ্কার এবং শুকনো রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে জরায়ুর মুখ ভেজা থাকে বলেই বেশি ইনফেকশন হয়।
  • স্যানিটারি ন্যাপকিন ৫ ঘণ্টা অন্তর অন্তর বদলাতে হবে।

সাদাস্রাব এর জন্য ডায়েটঃ

  • প্রতিদিন ২ চামচ টক দই খান।
  • ভাজাপোড়া খাওয়া একদমই বাদ দিতে হবে।
  • অ্যালার্জি যুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে।

জীবন যাত্রায় পরিবর্তনঃ

  • রাতে কম পক্ষে ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
  • রাত জাগা যাবে না।
  • ফাস্ট ফুড পরিহার করতে হবে।

সাদা স্রাব নিরাময়ে ঘরোয়া পদ্ধতিঃ

  • এলাচি দানা মেয়েদের জন্য খুব উপকারি। প্রতিদিন এলাচি খেলে শরীরে হরমোনের সমতা থাকে। সাদাস্রাব এর জন্য প্রতিদিন রাতে একটি গ্লাসে ৪/৫ টা এলাচি দানা দিয়ে রাখবেন। সকালে উঠে পানিটা খেয়ে ফেলবেন অথবা হারবাল চা-তে এলাচি দানা ব্যবহার করতে পারেন।
  • জরায়ুর মুখ ধোয়ার সময় ৫ চামচ ভিনেগার অথবা অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার এবং ১ চামচ লবন পানিতে মিশিয়ে ধুবেন, আরাম পাবেন।
  • প্রতিদিন ১/২ কোয়া রসুন খেলে সাদাস্রাব কমবে।
  • আধা চামচ বেকিং সোডা পানিতে গুলিয়ে জরায়ুর মুখ ভালো ভাবে ধুলে সাদাস্রাব কমবে।

সাদাস্রাব খুব বেশি আকার ধারন করলে ডাক্তার এর শরণাপন্ন হতে হবে। জরায়ুর মুখ পরিষ্কার এবং শুকনো রাখলে, ইনফেকশন হওয়ার হার অনেক কমে যায়।


মায়া আপা থেকে নির্বাচিত প্রশ্নঃ

আপা  আমার ওয়াইফ এর খুব বেশি তল পেটে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।  কিছু খেতে পারছে না।  আর তাছাড়া থেকে থেকে ধাতু ভাংতেছে।  এখন। কি করনীয়??   বা কি ওষুধ দিব তাকে????  উল্লেখ্য যে এ সব সমস্যার ১ দিন আগে আমরা সহবাস করেছিলাম। 

Avatar
প্রিয় গ্রাহক,
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ।
গ্রাহক,আমি কি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি?আপনার স্ত্রীর বয়স কত? ওনার এই পেট ব্যাথা টি কত দিন ধরে হচ্ছে?  ব্যথা টি আর কথাও ছড়ায়?ব্যাথার ধরন টি কিরকম একটু বর্ণনা করতে পারবেন?চাপা ব্যাথা না তিব্র ব্যাথা?
গ্রাহক আপনার স্ত্রীর পায়খানা কি ঠিক মতো হয়?পায়খানা কি কষা হয়?ওনার কি পেশাপ করার সময় জ্বালা পোড়া হয়? ওনার আর কোন শারীরিক অসুস্থতা আছে কি? ওনার স্রাবে কি কোন দুর্গন্ধ আছে? ওনার যৌনাঙ্গে কোন চুলকানি আছে? 
এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানা থাকলে আমাদের আপনাকে সাহায্য করতে সুবিধা হত। যেহেতু আমরা আপনার স্ত্রীকে পরীক্ষা করে দেখতে পারছিনা তাই সঠিক ভাবে ব্যাথার কারণ টি বলা সম্ভব হচ্ছে না।
তলপেটের ব্যাথার বিভিন্ন কারন থাকতে পারে যেমন-
*মাসিক এর সময় ব্যাথা যাকে বলা হয় Dysmenorrhoea
*পেশাপের রাস্তার infection এর ব্যাথা যাকে বলা হয় UTI
*কষা হলেও তলপেটে ব্যাথা হতে পারে।
*kidney infection এও তলপেটে ব্যাথা হতে পারে।
*মেয়েদের ক্ষেত্রে gynaecological কিছু problem যেমন Endometriosis এর কারনেও তলপেটে ব্যাথা হতে পারে।
গ্রাহক,  আপনার স্ত্রীর পায়খানা কষা হলে ভুসি খেতে পারেন।আর শাক সবজী ফল্মুল বেশি করে খাবেন। পেশাপ এ জ্বালা পোড়া থাকলে বেশি করে পানি খাবেন।প্রয়োজননে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে এন্টিবায়োটিক খেতে হবে। ব্যথার জন্য আপনি নাপা খেতে পারেন।ব্যাথার যায়গায় গরম শেক দিতে পারেন।কিন্তু এতেও যদি কোন উন্নতি না হয় আপনি অবশ্যেই একজন Medicine Specialist এর সাথে দেখা করবেন।উনি আপনার পরীক্ষা করে ঠিক চিকৎসা টি দিতে পারবেন।
গ্রাহক, সাদা স্রাব সাধারণত মেয়েদের যোনিপথ পরিষ্কার রাখার কাজ করে। খেয়াল রাখুন এটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী কিনা। তবে অনেক সময় স্বাভাবিক ভাবেই বেশী বেশী সাদা স্রাব যেতে পারে। যেমন- বয়সন্ধিরসময়, ovulation এরসময়, যৌন উত্তেজনার সময়, প্রেগন্যান্সির সময়, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে, ইত্যাদি। আবার অনেক সময় যোনি মুখ বা যোনি পথের কোন সুপ্ত রোগ থাকলে ও সাদা স্রাবের পরিমান বেড়ে যেতে পারে। এর সাথে যদি যোনিপথে চুলকানি, জ্বালাপোড়া থাকে, দুর্গন্ধ থাকে, থকথকে ঘন স্রাব হয়, তাহলে বুঝবেন আপনার কোন ইনফেকশান হয়েছে। সবচেয়ে কমন হচ্ছে vaginal candidiasis (এক ধরনের ছত্রাক সংক্রম)। সেক্ষেত্রে আপনার অবশ্যই একজন গাইনি ডাক্তারের সাথে দেখা করে anti fungal ঔষধ খেতে হবে এবং মলম লাগাতে হবে।
সাদা স্রাব যদি আপনার কাছে সমস্যা মনে হয়, তাহলে প্রথমেই কাজ হবে আপনার যৌনাঙ্গ পরিষ্কার রাখা এবং নিজের স্বাস্থ্য ভালো করা। প্রতিবার প্রস্রাব করার পর কুসুম গরম পানি দিয়ে যৌনাঙ্গ পরিষ্কার করতে হবে.   ব্যবহার করা পায়জামা ও অন্যান্য কাপড় সবসময় পরিষ্কার করে ধুয়ে ভালো মত রোদে শুকাতে হবে. এবং যদি উপরে উল্লেখিত বিষয় গুলো বুঝতে পারেন, তাহলে অবশ্যই একজন গাইনি ডাক্তারের সাথে দেখা করবেন সমস্যাটি নিয়ে। পরীক্ষা করে সঠিক কারন বের করে এর চিকিৎসা করা হয়।
আশা করি আপনাকে সাহায্য করতে পেরেছি।
আর কোন প্রশ্ন থাকলে, মায়া আপাকে জানাবেন,
রয়েছে পাশে সবসময়,
মায়া আপা ।

Post a Comment

0 Comments